বিজ্ঞাপন:
সংবাদ শিরোনাম:
ঠাকুরগাঁওয়ে দুর্গাপূজা উপলক্ষে পুলিশ সুপারের মত বিনিময় সভা নরসিংদীর পলাশে হাত,পা ও লিঙ্গ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় শাহজাহান ৭৫ বছরের বৃদ্ধার মৃত দেহ উদ্ধার করলেন পুলিশ অবশেষে ফুলবাড়ী বাশির দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ করলেন এমপি রেজওয়ানুল হক নবীনগরে পূর্ব বিরোধের জেরে গুলাগুলি নবীনগরে গুরুতর আহত অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আদিতমারীতে প্রবাসীর স্ত্রীকে ধ’র্ষণের অ’ভিযোগে যুবক গ্রে’প্তার সুন্দরগঞ্জে সাংবাদিকের গলা চেপে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ, টাকা-স্বর্ণালঙ্কার লুট দেবীগঞ্জে দুই মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে স্কুলশিক্ষক নিহত, আহত ২ ওমরাহ ও সৌদি আরব সফর শেষে কক্সবাজারে জামায়াতের জেলা আমির নূর আহমদ আনোয়ারী সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে আলোচিত নারী মানবপাচারকারী গ্রেপ্তার, বেরিয়ে আসছে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া আন্তর্জাতিক চক্রের ভয়ঙ্কর তথ্য
বেতন তুলছেন শিক্ষক, স্কুলে নেই ক্লাস— গাইবান্ধার চরাঞ্চলে শিক্ষা বিপর্যয়

বেতন তুলছেন শিক্ষক, স্কুলে নেই ক্লাস— গাইবান্ধার চরাঞ্চলে শিক্ষা বিপর্যয়

গাইবান্ধা প্রতিনিধি: বেতন ঠিকই তুলছেন শিক্ষকরা, কিন্তু স্কুলে নেই নিয়মিত ক্লাস—এমন চিত্রে গাইবান্ধার চরাঞ্চলের প্রাথমিক শিক্ষা কার্যত বিপর্যয়ের মুখে। যাতায়াতের অজুহাতে অনেক শিক্ষক বিদ্যালয়ে না গিয়ে প্রক্সি দিয়ে পাঠদান চালাচ্ছেন, আবার কেউ কেউ মাসের পর মাস অনুপস্থিত থাকছেন। ফলে শ্রেণিকক্ষ ফাঁকা, ভেঙে পড়ছে শিক্ষার ভিত্তি।

যাতায়াতের অজুহাতে অধিকাংশ শিক্ষক চরের বিদ্যালয়ে নিয়মিত যান না। চরে না থেকে জেলা শহরেই অবস্থান করেন। অনেকে আবার নিজে না গিয়ে প্রক্সি শিক্ষক দিয়ে ক্লাস চালান। শিক্ষাদান অনিয়মিত হলেও প্রতি মাসে সরকারি বেতন ঠিকই তুলছেন তারা।

চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের অভিযোগ, স্কুলগুলোতে শিক্ষকেরা ঠিকমতো আসেন না। কেউ আসলেও যাতায়াত আর হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর দিয়ে চলে যান। শিক্ষক নিজে পাঠদান না করে, অন্য একজনকে দিয়ে পাঠদান করান। অনেকে মাসের পর মাস আসেন না। এ জন্য শিক্ষার্থীরাও আর স্কুলমুখী হতে চায় না।

তবে শিক্ষকদের বক্তব্য, শুষ্ক মৌসুমে নদী পার হয়ে মাইলের পর মাইল হাঁটা আর বর্ষা মৌসুমে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উত্তাল নদী পাড়ি দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছানোর পর মানসিক বিপর্যয় ঘটে। এতে পাঠদানের মানসিকতা তাঁদের হারিয়ে যায়।

গাইবান্ধা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, জেলার চরাঞ্চলবেষ্টিত চারটি উপজেলায় মোট ১১৬ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় ৩০টি, গাইবান্ধা সদরে ১৫, ফুলছড়িতে ৫৮ ও সাঘাটায় ১৩টি। এসব বিদ্যালয়ে ৪৭২ জন শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন। আর শিক্ষক শূন্য রয়েছে ২২৪টি পদ। প্রাক্‌-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ২ হাজার ৯১৫।

চর এলাকার এমনই একটি স্কুল ফুলছড়ি উপজেলার এড়েন্ডাবাড়ী ধলীপাটাধোয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। দূর থেকে বোঝার কোনো উপায় নেই যে এটি একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়। চার কক্ষের বিদ্যালয়টিতে গিয়ে দেখা যায়, অফিস কক্ষটিতে প্রধান শিক্ষক লডলিস সুলতানা আর সহকারী শিক্ষক মারুফা আকতার, নূরজাহান লায়লা ও নৈশপ্রহরী মমিনুর গল্প করছেন। দুপুর সাড়ে ১২টায় বিদ্যালয়টিতে কোনো শিক্ষার্থী নেই।

প্রতিবেদকের পরিচয় জানার পর শুরু হয় শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি ছোটাছুটি। এক ঘণ্টায় চারজন শিক্ষার্থী সংগ্রহ করতে পারেন। কিন্তু হাজিরা খাতায় শিশু শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৭৭।

প্রধান শিক্ষক লডলিস সুলতানা বলেন, ‘আমি একজন নারী হয়ে শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিক্ষার্থী আনা সম্ভব? তা ছাড়া গাইবান্ধা জেলা শহর থেকে যাতায়াত করতে কী পরিমাণ সময় লাগে, আপনারা সেটা জানেন? এখানে দুজন নারী শিক্ষক আছেন। তাদেরই-বা কী বলব। সবারই তো একই সমস্যা। সবাই আমরা কষ্ট করে নদীর বালু-পানি পার হয়ে আসি। শিক্ষার্থী না আসায় আমাদেরও খারাপ লাগে।’

‘শ্রেণিকক্ষে চেয়ার, বেঞ্চ কিছুই নাই, ক্লাস নিবেন কীভাবে?’ এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থী আগে আসুক, পরে দেখা যাবে।’

ধলীপাটাধোয়া চরের স্থানীয় বাসিন্দা গৃহিণী শাহিনুর বলেন, ‘শিক্ষকেরা না আসলা পোলাপানরা স্কুলে যাবো? শিক্ষকরা মাসোত দশ দিন, পনের দিন পরপর আসে। এতে ছাত্রছাত্রী থাকবো? এজন্য বেগটি ছোলপলকে শহরোত পড়ার জন্য পাঠাইছি।’

সদর উপজেলার চিতুলিয়া চর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়টি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৪০। কোনো শিক্ষক নেই। রহিম নামে এক যুবক ক্লাস নিচ্ছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিদ্যালয়টিতে শুধু একজন প্রধান শিক্ষক আছেন। যাতায়াতের অসুবিধার কারণে এখানে শিক্ষকদের পোস্টিং দিলে কেউ যোগদান করেন না। আর বাকিরা যোগদান করেই দুই মাসের মধ্য অন্য বিদ্যালয়ে চলে যান।

বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক আব্দুর রাজ্জাক বলেন,‘আপনাদের কাছে রিকোয়েস্ট, আপনারা বিদ্যালয়টির শিক্ষকসংকট নিয়ে একটি লেখেন। আমি উপজেলায় দাপ্তরিক কাজে গেলেই, একটি ছেলেকে রেখে যেতে হয়। কাউকে না রেখে গেলে, স্কুলটি একেবারে বন্ধ থাকবে।’

চরের আরেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেবলাগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এখানে শিক্ষার্থী থাকলেও মাত্র দুজন শিক্ষক। তাঁরাও নিয়মিত আসেন না বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

সুন্দরগঞ্জ উপজেলার লালচামার চর ভাটি বুড়াইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, বেলা সাড়ে ১১টায় কেউ নেই।

জানতে চাইলে স্থানীয় আবু হাসান বলেন, ‘এ স্কুলের স্যাররা তাদের ইচ্ছামতো যাওয়া-আসা করেন। আমরা বললেই বলে নৌকা ছাড়তে দেরি হইছে। উপজেলায় কাজ ছিল। নানান ধরনের অজুহাত দেয়।’

এ বিষয়ে ফুলছড়ি উপজেলার এটিও আবু সুফিয়ান বলেন, ‘চরে যাতায়াত সমস্যার কারণে স্কুলগুলো ভিজিট করা সম্ভব হয় না। তা ছাড়া ফুলছড়িতে ছয়জন এটিওর কাজ মাত্র দুজনকে দেখতে হয়। তারপরও যে যে স্কুলগুলোতে সমস্যা, সেগুলো দেখার চেষ্টা করব।’

গাইবান্ধা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার লক্ষণ কুমার দাস বলেন, ‘চরের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকেরা যেতে চান না। কেউ চাকরি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর স্ট্যাটাস পরিবর্তন করেন। কেউ কোনো অফিসার বা নেতার কাছে গিয়ে লবিং করে অন্যত্র বদলি হন। এ ছাড়া অনলাইন বদলির কারণে আমরা নিজেরাই বলতে পারি না, কোন শিক্ষক কোথায় যোগদান করলেন।’

তিনি আরও বলেন, যাঁরা চরে পোস্টিং নেন, তাঁরা যাতায়াতের সমস্যাসহ নানান অজুহাত দেখান। তারপরও কেউ ইচ্ছা করে স্কুলে না গেলে, তাঁদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। স্থানীয় অভিভাবক ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা সচেতন হলে ও সহযোগিতা করলেই শিক্ষকদের ক্লাস ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ থাকবে না। এতে প্রাথমিক শিক্ষার মান অনেকটাই বাড়বে।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ওয়েবসাইট এর কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পুর্ণ বেআইনি।
Design & Development BY : ThemeNeed.com